বাবা হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নিষাদ ও নিনিত -ফাইল ছবিগত বছরের ঈদের কথা। বৃহদান্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। চিকিৎসকদের বারণ সত্ত্বেও দুই পুত্র নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে যান পাশের মসজিদে। আদায় করেন ঈদের নামাজ।
ঘরে ফিরে স্ত্রী মেহের আফরোজের রান্না করা বিভিন্ন পদ দিয়ে দুপুরের খাবারও খান। সেদিন অতিথি হয়ে বাসায় গিয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। তার সঙ্গেও খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডায় কাটিয়েছিলেন অনেকটা সময়। সব মিলিয়ে সুখী একজন মানুষের মতোই ঈদের দিনটি কাটিয়েছিলেন হুমায়ূন।ঈদের দিনটি কাটিয়েছিলেন হুমায়ূন। বছর ঘুরে আবারো ঈদ এসেছে। কাল চাঁদ দেখা গেলে পরশু পবিত্র ঈদুল ফিতর। আবারো নতুন জামা পরবে নিষাদ ও নিনিত। কিন্তু, নতুন জামা পরে খুদে আঙ্গুল ছুঁতে পারবে না প্রিয় বাবার হাত। কারণ, বাবা নেই। নিষাদের ভাষায়, তার বাবা এখন আউটার স্পেসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ছোট এ দুই শিশুর জন্য আসছে বেদনার ঈদ। তাদের বাবা আউটার স্পেস থেকে আসতে পারবেন না। কারণ, তিনি তো সকল মায়া-বন্ধন ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন 'অচিন দেশে, অচিন কোনো গাঁয়ে'। গত ১৯ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপর ২৪ জুলাই তিনি নিজের গড়ে তোলা নন্দনকানন গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। এবার ঈদের দিন সেখানেই বাবার কবর জিয়ারত করবে নিষাদ ও নিনিত। তারা কবর জিয়ারত বোঝে না। আর বোঝে না বিদায়; তারা মাটি ছুঁয়ে আদর করে দেয় বাবাকে। ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় শাওনের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিষাদ ও নিনিত নুহাশপল্লী যাবে। সেখানেই তারা ঈদের নামাজ আদায় করবে বলে পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। হুমায়ুন আহমেদ কখনো একা ঈদ করা পছন্দ করতেন না। তিনি নিজের চারপাশে একটা বলয় গড়ে তুলেছিলেন। সেই বলয়ের মধ্যে থেকেই উদযাপন করতেন ঈদ। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঈদের দিন আর দশটা বাবার মতোই সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল সারতেন। এরপর একই রঙ ও নকশার পাঞ্জাবি পরে তিন বাপ-বেটা রওনা দিতেন কাছের ঈদগাহের উদ্দেশে। অনেক সময় হুমায়ুন আহমেদের বড় ছেলে নুহাশ হুমায়ুনও সঙ্গী হতেন তাদের। চারজন এক পোশাক পরে নামাজ পড়তেন, ছবি তুলতেন। স্মৃতিতে আবদ্ধ হয়ে রয়ে আছে সেই বিষয়গুলো। নামাজ পড়ে এসেই খাবারের টেবিলে বসে পড়তেন হুমায়ুন। ভোজন রসিক হিসেবে বেশ খ্যাতিই লাভ করেছিলেন তিনি। খাবারের টেবিলে সেমাই, মিষ্টি আর পায়েসের পাশাপাশি জায়গা করে নিত পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরুর মাংস, গরুর কলিজা। আর সাদা ভাত করা হলে নানা পদের ভর্তা দিয়েও বেশ মজা করে খেতেন হুমায়ুন। ঈদের দিন হুমায়ুন আহমেদ ছুটে যেতেন পল্লবীতে ছোটভাই আহসান হাবীবের বাসায়। সেখানে মা আয়েশা ফয়েজের পা ছুয়ে সালাম করতেন। মাও তার প্রিয় সন্তানকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতেন। দোয়া করতেন লম্বা আয়ুর জন্য। এবার আর তা করা হবে না। আহসান হাবীব যায়যায়দিনকে বলেন, এবারের ঈদ তাদের জন্য কেমন হবে, তা তো বুঝতেই পারছেন। আম্মা একদম ভেঙ্গে পড়েছেন। ইচ্ছা আছে দাদাভাইয়ের (হুমায়ুন আহমেদ) কবর জিয়ারত করতে যাওয়ার। নোভা, শীলা, বিপাশা ও নুহাশও যেতে পারে। তবে কবে যাবেন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। 'রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ'_ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ গানের প্রতি লাইনে রয়েছে ঈদের অনাবিল আনন্দের বার্তা। কিন্তু আনন্দের এ বার্তা এবার বিষাদের সুর হয়ে বাজবে পাঁচ বছরের নিষাদ ও দুই বছরের নিনিতের কানে। ছোট বলে হয়তো বুঝবে না, কিন্তু পাশে বসে থাকা মায়ের কান্নার ছায়া পড়বে তাদের নিষ্পাপ মুখে। ছুটে যেতে চাবে বাবার কাছে। বাবার কাছে যেতে পারবে, কিন্তু বাবা পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারবে না 'আমার নিষাদ, আমার নিনিত'।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন