অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান মনে করেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্রের নীতি অনুসরণ করা৷ বৃহস্পতিবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি এই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যেই ব্যাংকটির সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করেছেন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর বুধবার রাতে এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। প্রসঙ্গত, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরিয়ে দেয়ার পর এতে এখন পর্যন্ত নতুন এমডি নিয়োগ দিতে পারেনি পরিচালনা পরিষদ।
বুধবার জারি করা সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুসারে, এমডি নিয়োগে ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের বিদ্যমান ক্ষমতা আর থাকছে না। নিয়োগের ক্ষমতা পাচ্ছেন ব্যাংকটির সরকার নিযুক্ত চেয়ারম্যান। তিনি একটি বাছাই কমিটি গঠন করে এমডি নিয়োগ দেবেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বুধবার এও জানিয়েছেন যে, এক সপ্তাহের মধ্যে এই বাছাই কমিটি গঠন করা হবে এবং এই কমিটির ‘চেয়ারম্যান' হিসেবে ড. ইউনূসকে নিয়োগের কোনো সম্ভাবনা নেই।
গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূসকে এড়িয়ে চলার একটি প্রবণতা বর্তমান সরকারের মধ্যে প্রকট৷ অথচ এই ক্ষুদ্র ঋণ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ড. ইউনূস। তিনি এ ব্যবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা ও ধারণা রাখেন বলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতিও পেয়েছে।
এ বিষয়ে জার্মান আন্তর্জাতিক বেতার- ডয়েচে ভেলে’তে বৃহস্পতিবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে৷ এতে করে সরকারের কী লাভ হবে, সেটা সরকারই বলতে পারবেন৷ তবে এধরনের বিতর্কে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে৷’’
ডয়েচে ভেলে’র আরাফাতুল ইসলামকে ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘‘(গ্রামীণ ব্যাংকের) নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন হলে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হলে এটির গ্রাহকদের আস্থা কমে যাবে৷ গ্রাহকদের আস্থা কমে গেলে প্রতিষ্ঠানটিও দুর্বল হয়ে যাবে৷ কারণ, গ্রামীণ ব্যাংকে আট হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে ব্যাংকটির সদস্যরা৷’’
গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে৷ ইতিমধ্যে একাধিকবার এই ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন তার বাংলাদেশ সফরে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন৷ ড. খান বলেন, ‘‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতিতে অনঢ়৷ সরকারও তাদের অবস্থানে অনঢ়৷ কাজেই এই অনঢ় অবস্থানে থাকার ফলে কি পরিস্থিতি হয় সেটা আমাদের দেখতে হবে৷’’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের সংকট নিরসনের প্রতি জোর দেন৷ তিনি বলেন, ‘‘গ্রামীণ ব্যাংকের অর্ডিনেন্স অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যরা ব্যাংকটির ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক৷ আরো ২২ শতাংশ শেয়ার তারা সরকারের কাছ থেকে কিনেছেন৷ কিন্তু সরকার কাগজপত্র এখনো চূড়ান্ত করেনি৷ এই কাগজপত্র চূড়ান্ত করলে ৯৭ শতাংশে শেয়ারের মালিক হচ্ছেন ব্যাংকটির সদস্যরা৷ কাজেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের হাতেই ব্যাংকটির পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া উচিত৷ সেটা করলে আস্থার সংকট হবে না এবং ব্যাংকটিও ভালোভাবে চলবে৷’’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন