ট্রেনের টিকিট সঙ্কটের পর দেখা দিয়েছে ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়। বাসের টিকিট নেই, আছে পথে পথে নজিরবিহীন যানজট আর সীমাহীন দুর্ভোগ। লঞ্চে কেবিন তো দূরের স্বপ্ন, দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার। বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই। এভাবে পথে পথে সীমাহীন বাধা আর দুর্ভোগ উপেক্ষা করেই নাড়ির টানে ছুটে চলছে ঘরমুখো অসংখ্য মানুষ। এসব যাত্রী জানেন, পথের এই ক্লান্তিকে মুহূতেই মুছে দেবে প্রিয়জনের সান্নিধ্য।
বেসরকারি অফিস, শিল্প কারখানাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে গতকাল থেকে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। শেষ কর্মদিবসের পরই সব শ্রেণী-পেশার মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। তবে গণপরিবহনের নাজুক অবস্থায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন ঘরমুখো মানুষ। এর মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে গতকাল ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ট্রেন যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগে ফেলে দেয়। প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের ১-৪ ঘণ্টা দেরিতে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। রাজশাহীর চারঘাটে একটি আন্তঃনগর ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ায় প্রায় ২০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকা ও খুলনার রেল চলাচল শুরু হয়েছে। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে একটি দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে ঈদের ঘরমুখো লাখো যাত্রী।
গতকাল রাজধানীর বাস, লঞ্চ ও ট্রেন স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে পথে পথে যাত্রীরা নানাভাবে হয়রানি ও আর দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বড় বড় পরিবহন কোম্পানির বাসও নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। লঞ্চ-স্টিমারের শিডিউল বিপর্যয় না হলেও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করার পর ছাড়ছে। টাকা থাকলেও অনেকেই কেবিন পাচ্ছেন না। যাত্রীদের চাপ এতটাই বেশি যে ছাদেও জায়গা পাচ্ছেন না অনেকেই। লঞ্চের ভেতরে ঠায় দাঁড়িয়েই দীর্ঘ যাত্রার প্রসু্ততি নিচ্ছেন অনেকে। যাত্রীদের অত্যধিক চাপের কারণে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় লঞ্চগুলো ছেড়ে গেলও নির্বিকার প্রশাসন।
ঈদ যাত্রীদের পদচারণায় টার্মিনালগুলোর কোথাও যেন একটু ফাঁকা নেই। যে যেভাবে সুযোগ পেয়েছেন সেভাবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আগাম টিকিট না পাওয়া মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই বাসে করে দূরপাল্লার পথ পুরোটাই দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন।
বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে, গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর ঘরমুখো মানুষের আগমন ঘটতে থাকে। সময় যতই বাড়ে মানুষের ভিড় ততই বাড়ে। যানবহনের স্বল্পতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যানজট, ট্রেন ও বাসের দেরিতে ছাড়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঘরমুখো মানুষকে ফেলেছে নানা ভোগান্তিতে। এর সঙ্গে পকেটমার, অজ্ঞান ও মলম পার্টির তত্পরতা যাত্রীদের মনে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার সৃষ্টি করে।
ঈদ উপলক্ষে কত মানুষ ঢাকা ছাড়ে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া অসম্ভব। তবে সরকারের পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বেসরকারি বাস ও লঞ্চ মালিক এবং বিভিন্ন সূত্র মতে, এ ঈদে অর্ধকোটির বেশি মানুষ রাজধানী ঢাকা ছেড়ে যায়।
ট্রেনের শিডিউল লণ্ডভণ্ড : সময় মেনে চলে না ট্রেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনা। রাজশাহীর চারঘাটে আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ায় প্রায় ২০ ঘণ্টা বন্ধ ছিল রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকা ও খুলনার রেল চলাচল। ঈদের এ ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রেলের সময়সূচিতে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। রাজধানী ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে চলাচলকারী প্রায় প্রতিটি ট্রেন কয়েক ঘণ্টা করে বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে রোজার মধ্যে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের।
পদ্মা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় বিভিন্ন গন্তব্যের তিনটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এসব ট্রেনের আগাম টিকিট সংগ্রহকারীদের ঈদ আনন্দের মধ্যে হতাশার ছাপ পড়েছে। গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে অতিরিক্ত যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ এসব যাত্রীর বসার তেমন কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। যাত্রীরা জানান, জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি বেলা ১১টা পর্যন্ত ঢাকাতেই পৌঁছায়নি। রংপুর এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল সকাল ৯টায়। সেটিও বেলা ১১টা পর্যন্ত ঢাকায় আসতে পারেনি। খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা পর কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছেছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনের রিজার্ভেশন সহকারী মাজহারুল হক সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা-রাজশাহী-লালমনিরহাট, ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-দিনাজপুর-নীলফামারী লাইনের প্রতিটি ট্রেন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিলম্বিত হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম-নোয়াখালী, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ লাইনের ট্রেনগুলো বিলম্বিত হচ্ছে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা। কমলাপুরের রেলস্টেশনের ম্যানেজার খাইরুল বাশার ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, রাজশাহীতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়া ও অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানামার কারণে ট্রেনের আসা-যাওয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
শিডিউল ভেঙে পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। জামালপুরগামী ট্রেনের যাত্রী শহীদুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ট্রেন কখন ছাড়বে তা সুনির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। আমাকে বলেছে, ১১টায় ট্রেন ছাড়বে, এখনও ছাড়ল না। আবার কাউকে কাউকে বলেছে, ১২টার পর ছাড়বে। কী করব বুঝতে পারছি না। এদিকে যেসব ট্রেন ছেড়ে গেছে সেগুলোয় অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। ট্রেনের ছাদ থেকে শুরু করে ইঞ্জিন, ক্যান্টিন, কামরার জোড়া, বাম্পারসহ সবখানেই মানুষ আর মানুষ। রেলওয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরা এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলা মানুষদের বাধা দেয়ার সাহস পাননি। তবে রেলওয়ের নিরাপত্তা কর্মীদের দাবি, ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা নিষিদ্ধ হলেও তা মানছেন না যাত্রীরা। যাত্রীদের ছাদে ওঠতে বাধা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা তা মানছেন না। বরং জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও উল্লাস করে ছাদে উঠছেন।
ঈদের আগ মুহূর্তে কালোবাজারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। গতকাল সকালে টিকিট কালোবাজারির সময় হুমায়ুন নামে কমলাপুর রেলস্টেশনের এক কর্মচারীকে আটক করেছে আর্মড পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিভিন্ন ট্রেনের ১২টি টিকিট পাওয়া গেছে। আর্মড পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, টিকিট কালোবাজারি করছে একটি চক্র। হুমায়ুন সেই চক্রের সদস্য। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হুমায়ুন জানিয়েছেন, টিকিট কালোবাজারির টাকার ভাগ স্টেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পাচ্ছেন।
লঞ্চের ছাদেও জায়গা নেই : সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বহন করেছে। কেবিন, ডেক, ছাদসহ সব স্থানে যাত্রী ভরে গেলেও লঞ্চ ছাড়া হয়নি। রোদ ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভোগান্তির শিকার যাত্রীরা আগভাগে লঞ্চ ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানালেও তা আমলে নেননি মালিক ও শ্রমিকরা। তারা টার্মিনালে লঞ্চ ভিড়িয়ে রেখেছেন আরও যাত্রীর আশায়। উপায় না দেখে লঞ্চের ছাদে চড়ে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। গতকাল বিকালে সদরঘাট ঘুরে দেখা গেছে, লঞ্চে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার সহসভাপতি সাহাবুদ্দিন মিলন। তিনি বলেন, লঞ্চে যাত্রী বোঝাই হওয়ার পরই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। ঈদের সময় যাত্রীর চাপ বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি লঞ্চের দাম কয়েক কোটি টাকা। কোনো মালিক চান না অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে তার লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হোক। আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিতে দেখছি।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রয়োজনের চাইতে লঞ্চের ঘাটতি রয়েছে। লঞ্চ মালিকরা দাবি করছেন, দক্ষিণাঞ্চলের ৩০ লাখ লঞ্চযাত্রী রয়েছে। কেবিন, ডেক ও সোফা মিলিয়ে লঞ্চে এ পরিমাণ যাত্রী বহনের কোনো সুযোগ নেই। ফলে বাধ্য হয়েই যাত্রীরা লঞ্চের ছাদে চড়ছে। কর্তৃপক্ষের মানা তারা শুনছে না।
এদিকে বিভিন্ন লঞ্চের পাটাতন ও ছাদের স্থান কর্মচারী ও আনসার সদস্যরা বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে। একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, চাদর বিছিয়ে বসলে অতিরিক্ত ৭০ টাকা করে দিতে হয়। এসব টাকা লঞ্চের কর্মচারীরাই আদায় করছে। ডেক ও ছাদে কিছু অসাধু লোক আগে থেকেই চাদর বিছিয়ে জায়গা দখল করে রাখছে বলে জানা যায়। যাত্রীরা এলে তাদের কাছ সে জায়গার বিনিময়ে টাকা আদায় করে নিচ্ছে এসব দালালরা।
বাসে চাপ কিছুটা কম : রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে সকালে যাত্রীদের ভিড় বেশি থাকলেও দুপুর ও বিকালে কম ছিল বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর মহাখালী বাস স্ট্যান্ড থেকে তাত্ক্ষণিক টিকিট বিক্রি করে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে বাস। গাবতলী, মালিবাগ, কল্যাণপুর ও মতিঝিল থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাসের কোম্পানি শিডিউল অনুযায়ী বাস ছাড়তে পারেননি। এদিকে রাজধানীর বাস স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অখ্যাত বাস কোম্পানিগুলো বাড়তি আয়ের আশায় আসনের বাইরে যাতায়াতের পথে মোড়া বিছিয়ে যাত্রী বহন করেছেন। ফলে অনেক বাসে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে গেছেন। আবার অনেকে বাসের ছাদে চড়ে গেছে।
গাবতলী-রাজশাহী, গাবতলী-সৈয়দপুর, গাবতলী-দিনাজপুর, গাবতলী-রংপুর, ঢাকা-দাউদকান্দি, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ, ঢাকা-নরসিংদীসহ কয়েকটি রুটের বাসের ভেতর দাঁড় করিয়ে এবং ছাদে যাত্রীদের নিতে দেখা গেছে। রংপুরগামী লামইয়া এন্টারপ্রাইজ বাসের যাত্রী বাবুল মোল্লা বলেন, এসব বাসে আগে ভাড়া নিত আড়াই শ’ টাকা। এখন ভাড়া নিয়েছে সাড়ে ৩শ’ টাকা। বাড়তি ভাড়া নেয়ার পরও মানুষের হাঁটার পথে মোড়া পেতে তাতে মানুষ বসানো হচ্ছে। চালকের পাশে ইঞ্জিন কাভারে বসানো হয়েছে ৬ জন। এমনকি ছাদে নেয়া হয়েছে প্রায় ৫০ জন।
এ ছাড়া ঈদে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাস মালিকরা ঢাকায় সিটি সার্ভিস ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলাচল করে এমন বাস রং করে ঢাকায় এসেছেন। বিশেষ করে সায়েদাবাদ-কিশোরগঞ্জ, সায়েদাবাদ-ভৈরব, সায়েদাবাদ-দাউদকান্দি, মহাখালী-ময়মনসিংহ, মহাখালী-জামালপুর, গাবতলী-পাবনা, গাবতলী-রাজশাহীসহ বেশ কিছু রুটে পুরনো বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। এছাড়া সিটি সার্ভিসের বেশকিছু বাস বিভিন্ন রুটে ছেড়ে গেছে। এছাড়া গাবতলী থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, পাবনা, রংপুর, সৈয়দপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কিছু গন্তব্যে খোলা ট্রাকে চড়ে বাড়ি গেছেন ঈদযাত্রীরা।
বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফেরা : বাস ও ট্রেনের আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়া যাত্রীদের বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। অনেক যাত্রী ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ মাওয়া ও পাটুরিয়া পার হয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি অনেকেই মাইক্রোবাস, ট্যাক্সিক্যাব ও লোকাল বাস রিজার্ভ করে গেছেন। একই এলাকার কয়েকজনকে একত্রে মিলে বাস, ট্যাক্সিক্যাব-মাইক্রোবাস ভাড়া করে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
কুমিল্লায় ফের দীর্ঘ যানজট : আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে একটি দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে ঈদের এই সময়ে ঘরমুখো যাত্রীরা। গতকাল সকালে জিংলাতলী এলাকায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষের পর দেড় ঘণ্টা মহাসড়কে চলাচল বন্ধ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। জিংলাতলী এলাকায় দুর্ঘটনায় নিহত হন ট্রাকচালক মো. লিটন মিয়া (৪০)। তিনি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর গ্রামের কাজি মমিন উল্লাহর ছেলে।
এরপর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ লাইনে গাড়িগুলো চলছে থেমে থেমে। ঈদের ছুটির প্রথম দিন বুধবারও গাড়ির চাপে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল।
মহাসড়ক পুলিশের দাউদকান্দি থানার উপ-পরিদর্শক মেহেদী হাছান বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জিংলাতলী গ্রামের কাছে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা একটি কাভার্ডভ্যান এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি মহাসড়কের উপরে থাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ি দু’টি রেকার দিয়ে সরিয়ে নিলে সকাল ৯টার দিকে যান চলাচল শুরু হয় বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী।
ঈদের কয়েকদিন আগে গাড়ির চাপ বেশি থাকায় কুমিল্লার গৌরীপুর ও নিমসার বাজার এলাকায় কিছু সময় পরপরই যানজট হচ্ছে। এর পাশাপাশি মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতুতে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায় যানজট সৃষ্টি করছে।
২০ ঘণ্টা পর ঢাকা-রাজশাহী ট্রেন চালু : রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহীর চারঘাটে একটি আন্তঃনগর ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ায় প্রায় ২০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকা ও খুলনার রেল চলাচল শুরু হয়েছে। রাজশাহীর চারঘাটের সরদহ স্টেশনের কাছে হলিদাগাছি এলাকায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর পদ্মা এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুত চারটি বগি গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধার প্রক্রিয়া শেষ হলে ওই রুটে স্বাভাবিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
এর আগে গত বুধবার বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চারঘাটে সরদহ স্টেশনের কাছে হলিদাগাছি এলাকায় লাইনচ্যুত হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সবকটি ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয় দেখা দেয়। আর এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ঈদে ঘরমুখো হাজার হাজার যাত্রী। এদিকে পদ্মা এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট সাইফুল ইসলামকে জানান, ঈশ্বরদীর রিলিফ ট্রেন বুধবার রাত সাড়ে ৯টার পর থেকে বিরতিহীনভাবে কাজ করে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধার কাজ শেষ হয়। বর্তমানে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ‘পদ্মা এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে সব ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখা যায়নি। তবে যাত্রীদের কথা চিন্তা করে বিকল্পভাবে ট্রেন চলাচল বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
এ ব্যাপারে পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফেরদৌস আলম সাংবাদিকদের জানান, রাতে উদ্ধার প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতিতে চললেও সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জোর তত্পরতা চালিয়ে লাইন সচল করা হয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে রাজশাহীর সরদহ রেল স্টেশনের কাছে হলিদাগাছি এলাকায় আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা এক্সপ্রেসের ৪টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় রাতেই ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাকশীর বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা সজিব কুমারকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিকে ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। সকালে তদন্ত দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বুধবার বিকালে ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে আসা সিল্কসিটি ট্রেনটি সরদহ হলিদাগাছি পর্যন্ত আসে, সেখান থেকে যাত্রীদের ধূমকেতু ট্রেনে করে রাজশাহী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে, রাতে ঢাকাগামী ধূমকেতু ট্রেন নির্ধারিত সময়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থল পর্যন্ত গিয়ে যাত্রীদের সিল্কসিটি ট্রেনে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
উল্লেখ্য, বুধবার বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে আন্তঃনগর পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চারঘাটে সরদহ স্টেশনের কাছে হলিদাগাছি এলাকায় লাইনচ্যুত হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সবকটি ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয় দেখা দেয়। আর এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে ঈদে ঘরমুখো হাজার হাজার যাত্রী।
জানা গেছে, ট্রেনের পেছনের দু’টি এসি ও একটি খাবারের বগিসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় রেল লাইনের স্লিপার উঠে যায়। দুর্ঘটনার সময় তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ১০-১২ জন যাত্রী আহত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন