সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। ১৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার লর্ডসে টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থান দখলের লড়াইয়ে নামছে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকানরা টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানের দখল সত্যি সত্যি পাগলের মতো চাইছে। দীর্ঘদিন ধরেই অনেকে সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। প্রোটিয়াসরা ধারাবাহিকভাবেই কখনো দুই নম্বর আবার কখনোবা তিন নম্বর স্থানের দখলটা বজায় রেখে চলেছে।
দেশের বাইরে সিরিজ জয়ের রেকর্ডও তাদের ভালো। অন্তত বেশ কয়েক বছর ধরে বিদেশের মাটিতে সিরিজ হারেনি তারা। কিন্তু টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানে ওঠা হয়নি তাদের। অবশ্য এটা নিয়ে দলটার যে খুব বেশি মাথাব্যথা আছে, তেমনটা মনে হয় না। হতে পারে যে, প্রোটিয়াসরা র্যাংকিং নিয়ে অতটা ভাবে না। কিন্তু লর্ডসে তাদের প্রতিপক্ষ তথা টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল ইংল্যান্ড চলতি বছরে খেলা দশটি ম্যাচের পাঁচটিতেই পরাজয়ের তেতো স্বাদ পেয়েছে।
অন্যদিকে চলতি বছরে দক্ষিণ আফ্রিকানদের ঝুলিতে একটি ম্যাচেও পরাজয়ের স্বাদ নেই। এই সময়ের মধ্যে তারা তিনটিতে জিতেছে, তিনটি ম্যাচে ড্র করেছে। বেশি ম্যাচ না খেলার কারণে বর্তমান আইসিসি র্যাংকিংয়ে তাদের অবস্থান তৃতীয়। র্যাংকিংয়ের দ্বিতীয় দল অস্ট্রেলিয়া ২০১২ সালে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি জয় পেয়েছে। পাঁচটি জয় ছাড়াও একটি ম্যাচ ড্র করেছে তারা।
টেস্ট র্যাংকিংয়ের বর্তমান পদ্ধতিটা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি, প্রতিটা সিরিজের সময় এবং কোন দলের বিপক্ষে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোন দল খেলছে-এসব বিষয়ই বিতর্কের সৃষ্টি করছে। র্যাংকিং নিয়ে নানা বিতর্কের কারণেই পুরো চিত্রটা সুস্পষ্ট হয় না। কেবলমাত্র ওপরে উঠলেই নিচের চিত্রটা পরিষ্কার বোঝা যায়। যে কারণে দক্ষিণ আফ্রিকানরা র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানের দিকে কড়া নজর রেখে গুটি গুটি পায়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা অবশ্য সেরা স্থানটার একেবারেই কাছে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। সম্ভবত এসব কারণেই প্রোটিয়াসদের গুরু গ্যারি কারস্টেন টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থান নিয়ে মুখ খুলেছেন।
সেরা স্থান দখলের মর্যাদাটা তিনি ভালোই জানেন। তিনি বলেছেন, কেউ কেউ মনে করেন, আমরা র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থান নিয়ে চিন্তিত নই। তারা কি হালে পানি পেয়েছে? গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, প্রতিটা দলই এক নম্বর স্থানে যেতে চায়, নিজেদের সেরা অবস্থানে দেখতে ভালোবাসে। কারস্টেন বলেছেন, অন্য যেকোনো দলের মতোই আমরাও বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। সেরা হওয়ার জন্য লক্ষ্য স্থির করলে এবং শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হিসেবে ভাবলে বিষয়টাকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
ইংল্যান্ডের মাটিতে এই মুহূর্তে একটা জটিল পরিস্থিতি চলছে। এক টেস্ট থেকে অন্য টেস্টের মধ্যে বেশ কয়েকদিনের ব্যবধান থাকার কারণে ক্রিকেটারদের ছন্দপতন ঘটছে। 'কেভিন পিটারসেন পর্ব' দক্ষিণ আফ্রিকান দলের ওপর কোনো প্রভাব না ফেললেও এটাকে অস্বীকার করা কঠিন। ক্রিকেটারদের ফুরফুরে মেজাজে রাখার তাগিদে কারস্টেন ও টিম ম্যানেজমেন্ট বিরতির সময়টাতে ক্রিকেটারদের নিয়ে মাঠের বাইরে বিভিন্ন কর্মকান্ড- যেমন নাচের পার্টিতে যাওয়া এবং টেলিভিশনের তারকা শিল্পীর সঙ্গে নৈশভোজনের আয়োজন করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকানদের সাফল্য সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিত গুরু কারস্টেন। প্রস্ত্ততির জন্য বিকল্প পদ্ধতিকেই যে সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রোটিয়াসরা ভাবছে, এমনটা নয়। দলটার মধ্যে গড়ে ওঠা একতাও তাদের জয়ের প্রেরণা জোগাচ্ছে। কারস্টেন বলেছেন, পরিকল্পনামাফিক ঠিকপথে এগোতে পারলে আমাদের হারানো কঠিন। বিগত বছরগুলোতে দেখা দক্ষিণ আফ্রিকার অনেকগুলো দলের জন্যই কথাগুলো সত্যি।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অতীতের দলগুলো নিজেদের শক্তির জানান দিতে সক্ষম হলেও চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি। বারবার সাফল্যের দরজায় কড়া নাড়লেও সেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি প্রোটিয়াসরা। কারস্টেন মুখে না বললেও বিশ্বাস করেন যে, বর্তমান দলটার কাছে সাফল্যের দরজা খোলার চাবিটা দিতে পেরেছেন।
ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণে দক্ষিণ আফ্রিকানরা এখন পূর্ণশক্তির দল। ছয়জন ব্যাটসম্যানের পাশাপাশি তিন পেসার এবং একজন স্পিনার এখন দলে। মার্ক বাউচার অবসরে যাওয়ায় স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের সংখ্যা বেড়ে সাত হয়েছে। জ্যাক ক্যালিসের মতো অলরাউন্ডারের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ড্রেসিংরুমে উৎসাহ জোগায়। অতীতে অ্যালান ডোনাল্ড ও ফানি ডি ভিলিয়ার্স জুটি কিংবা শন পোলক ও মাখায়া এনটিনি জুটি যা করতে পারেননি সেটাই করে দেখাচ্ছেন দুই পেসার ডেল স্টেইন এবং মর্নে মরকেল। এর কারণ হচ্ছে, এরা শুধুই পেস জুটি নন। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ব্যাকআপ হিসেবে ভারনন ফিল্যান্ডারও রয়েছেন।
স্পিনার ইমরান তাহিরের ব্যক্তিগত সাফল্য ততটা হয়তো নেই; কিন্তু দলে তার উপস্থিতিই অনেক প্রভাব ফেলে। একটা সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিনারদের ডাকা হতো শুধুমাত্র চা বিরতির আগের ওভারগুলোতে অথবা ড্রয়ের দিকে যাওয়া ম্যাচগুলোর শেষ দিকে, সেই দিন এখন আর নেই।
প্রোটিয়াস স্পিনাররা এখন বোলিংয়ে আক্রমণেরও ক্ষমতা রাখেন।
অলরাউন্ডার ক্যালিস ব্যাট হাতে গ্রায়েম স্মিথের চেয়েও এগিয়ে বলে মনে করা হয়। এরপর স্টাইলিশ হাশিম আমলার পেছনে থাকছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। আলভিরো পিটারসেনের দৃঢ়তা, জ্যাক রুডলফের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি জেপি ডুমিনিও ব্যাটিং লাইনআপের শেষদিকে বোলার পেটাতে সিদ্ধহস্ত। কারস্টেনের অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকানরা যেকোনো কন্ডিশনে খেলার দক্ষতা অর্জন করেছে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন প্রোটিয়াস কোচ। তিনি বলেছেন, সামনে যাই থাকুক না কেন, সেটাকে অতিক্রম করা চাই। এর প্রমাণ মেলে ওভাল টেস্টে। ইংলিশরা যেখানে মাত্র দুটো উইকেটের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল, সেখানে প্রোটিয়াসদের শিকার ছিল ২০ উইকেট।
অন্যদিকে ইংলিশ শিবিরে অনেকটাই বিশৃঙ্খল অবস্থা। হেডিংলি টেস্টের ম্যান অব দ্য ম্যাচ কেভিন পিটারসেন দলেই নেই। আগের ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়কে পরের ম্যাচে বাদ দেয়ার নজির বিরল। কিন্তু সেটাই ঘটেছে। বলা হচ্ছে, তার উপস্থিতি ড্রেসিংরুমে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। এই যখন
পরিস্থিতি, তখন শুধু কেভিন পিটারসেনকে বাদ দিয়েই সমস্যার কতটা সমাধান হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। ওভালে পরাজয়ের পর হেডিংলিতে কোনোরকমে ড্র করতে পারলেও ইংল্যান্ডের অবস্থা এখন 'ত্রাহি মধূসুদন'। কারণ র্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থান ধরে রাখতে হলে লর্ডসে বৃহস্পতিবারের মহারণে তাদের জয়ের বিকল্প নেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন