ঢাকা: বেশ কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি, শিক্ষক-ছাত্রদের মুখোমুখি অবস্থান, ছাত্রহত্যা, দলীয় সংকীর্ণতা ইত্যাদি ঘটনা বিবেচনায় রেখে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির লাগাম টেনে ধরতে যাচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক রাজনীতি বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, অন্তত ছাত্র রাজনীতির তুলনায়। ছাত্র সংগঠনগুলোর কোন্দল-সংঘর্ষ ও খুন -জখমের ঘটনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। আর সরকার পড়ছে বিব্রতকর অবস্থায়।
বিভিন্ন ক্যাম্পাসের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে ১৯৮৬ সালের মন্ত্রিসভা বৈঠকের একটি সিদ্ধান্ত নিয়েও নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে সরকার।
সূত্রমতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি সীমিত করার কথাই ভাবছে সরকার।
ছাত্র সংগঠনের কোন্দল আর শিক্ষা কার্যক্রম বাদ দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের জন্য শিক্ষক নেতাদের অপরাজনীতির শিকার হয়ে একের পর এক অচল হয়ে পড়ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। অস্থিরতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠছে ছাত্রশিবির, হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনগুলো। এতদিন ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হলেও এখন আর কেবল শিক্ষা নয়, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদ দখলসহ আধিপত্য বিস্তারের জন্য চলা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রশ্নের মুখে শিক্ষক রাজনীতি।
বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর সর্বশেষ জাহাঙ্গীনগরের তাণ্ডবেও মূল কলকাঠি নেড়েছেন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষকরা।
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনের কোন্দলে জটিলতার শুরু হলেও প্রতিটিতেই ক্যাম্পাস অচল হওয়ার মূল অভিযোগ উঠেছে এক শ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হাইকোর্ট ধর্মঘটের বিরুদ্ধে আদেশ দিলেও বুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতারা ধর্মঘটের দাবি নিয়ে আদালতে আপিল করতে যাবেন বলে জানিয়েছেন। শিক্ষকদের এ ধরনের আচরণে আবারো বিব্রত অবস্থায় পড়ে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘বিশ্ববিদ্যালয় অশান্ত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ছাত্র সংগঠনের কোন্দল ও শিক্ষক রাজনীতি’ শিরোনামে তথ্য প্রমাণসহ একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সরকারের কাছে। গোয়েন্দা সংস্থার এমন রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি সীমিত করার জন্য সরকার ১৯৮৬ সালে এরশাদের মন্ত্রিসভা বৈঠকের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে বলে জানান সূত্র।
সূত্র জানান, গত জুলাই মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে মন্ত্রিসভা-বৈঠকের সিদ্ধান্ত বান্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন চাওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বাস্তবায়নাধীন সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে ১৯৮৬ সালের একটি সিদ্ধান্ত যুক্ত করে দিয়ে বলেছে ওটাও বাস্তবায়নাধীন আছে।
এরশাদ সরকারের আমলে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে ইহাদের রাজনীতিমুক্ত করা উচিত।” বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির বতর্মান চেহারায় ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, শিক্ষকনেতারা বাস মালিক সমিতির মতো পুরো প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে ফেলেছেন।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছেন আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার করছেন রাজনীতি ও আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষক রাজনীতির টানাপোড়েনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীলতা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকরা তাদের রাজনীতির স্বার্থে ছাত্রদেরও ব্যবহার করছেন। একদিকে ছাত্র সংগঠনের কোন্দল, অন্যদিকে শিক্ষক রাজনীতির জাঁতাকলে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে অস্থির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে, শিক্ষক আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কোন্দলে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অস্থিরতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠছে জামায়াতপন্থী শিক্ষক, ছাত্রশিবির ও হিজবুত তাহরীর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুয়েট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল শিক্ষকদের তুলনায় সক্রিয় জামায়াত-বিএনপিপন্থী শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। দু’পক্ষের শিক্ষকরাই রাজনৈতিক কারণে একে অপরকে ছাড় দিতে চাচ্ছেন না। এ কারণে পরিস্থিতি সুরাহা হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের বিশেষ শাখার গোয়েন্দারা সম্প্রতি শিক্ষকদের ওপর একটি জরিপ চলিয়েছে।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ছয় শতাধিক। এর মধ্যে ১২৫ জন দেশের বাইরে রয়েছেন। বাকিদের মধ্যে ২২৫ জন আওয়ামী লীগ, ২০০ জন বিএনপি ও ৭৫ জন জামায়াতপন্থী।
গোয়েন্দা রিপোর্টে বুয়েট শিক্ষকদের সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে আবারো বলা হয়েছে, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের নিয়োগের ফলে জামায়াত ও হিজবুত তাহরীর প্রভাবিত শিক্ষক সমিতির একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়াই বুয়েট অস্থিরতার মূল কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির মাত্র ২২ ভাগ শিক্ষক বর্তমান সরকার ও প্রগতিশীল মতাদর্শের অনুসারী। ৭০ ভাগ শিক্ষকই বিএনপি-জামায়াত ও হিজবুত তাহরীরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি আট ভাগ শিক্ষক মোটামুটি নিরপেক্ষ। ১৩ সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষক সমিতির অধিকাংশই সরকারের ঘোরতর বিরোধী এবং তারাই হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রদের মদদ দিচ্ছেন।
সর্বশেষ আদালতের নির্দেশের পরেও আন্দোলনকারী বুয়েট শিক্ষক নেতা পরিচালক অধ্যাপক লুৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে সব আইন ও রীতিনীতি লংঘন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগদাবি ও গালিগালাজ করার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট গোপনে দখল করে একজন শিক্ষকের এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানোয় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে বুয়েটে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছাত্র নেতা সোহেল রানা নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও উপাচার্যের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সভাপতির সঙ্গে। মূলত এখানে সরকারপন্থী শিক্ষকরাই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে, ইতোমধ্যেই পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের ওপর কিছু ছাত্রের হামলার ঘটনায় অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনার জন্য দায়ী পাঁচ ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্কট চলেছে বহুদিন ধরে। শিক্ষকদের সাম্প্রতিক শিক্ষা বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন সরকার।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ``বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রয়োজন মনে করলে ইউজিসি সর্বাত্মক সহায়তা দিতে বদ্ধপরিকর।``
এ কে আজাদ বলেন, ``আগে দেখা যেত ছাত্ররা আন্দোলন করে এবং সেখানে শিক্ষকরা সংহতি প্রকাশ করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শিক্ষক নেতারাই আন্দোলন করেন। আর সেখানে ছাত্রদেরও টেনে আনা হচ্ছে।``

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন