“আমার ঈদও লাগবে না, আর জামা-কাফুরও লাগবো না। আমার আব্বারে আইন্না দেন!” গত শুক্রবার (১০আগস্ট) থেকে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি পাথরঘাটার বাদুরতলা গ্রামের ইউনুস মাঝির পাঁচ বছরের মেয়ের সুমাইয়া তার বাবাকে ফিরে পেতে এমন আকুতি জানাচ্ছিল সাংবাদিকদের কাছে।
তার করুণ কান্না শুনে চোখের জল বাধা মানেনি কারো। জলদস্যূদের হাতে জিম্মি পাথরঘাটার ৫৫টি জেলে পল্লীতে এখন শোকের মাতম চলছে। সারা মৌসুমের কৃচ্ছতা সাধনের পর বঙ্গোপসাগর যখন তার ভাণ্ডার জেলেদের জন্য খুলতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র হামলা চালিয়ে অপহরণ করেছে জেলেদের।
ঈদকে সামনে রেখে বঙ্গোসাগরে জলদস্যুদের জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতির ঘটনা মাথাচাড়া উঠেছে। নিহত জলদস্যু জুলফিকার বাহিনীসহ অন্তত পাঁচ/সাতটি বাহিনী পুরো সাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জেলেদের বরাত দিয়ে বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতি এবং একাধিক ট্রলার মালিকরা এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
বিগত এক সপ্তাহ ধরে সাগরে মোটামুটি মাছ ধরা পড়ায় জেলেরা অনেক আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের পক্ষীদিয়া এলাকায় জেলেরা জাল ফেলে অপেক্ষা করছিলেন। এমন সময় সুন্দরবনের জলদস্যু সাগর বাহিনী ওই জেলে বহরে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ট্রলার, মাছ, জাল, মোবাইল সেট ও রসদ সামগ্রী নিয়ে যায়।
এ সময় মুক্তিপণের দাবিতে তিনটি মাছধরা ট্রলারসহ দেড়শতাধিক মাঝি অপহরণ করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। এছাড়া, শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আরো একটি ট্রলারসহ ৫০ জেলেকে অপহরণ করেছে জলদস্যুরা। এর মধ্যে ৫৫ জন জেলের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।
অপহৃত জেলেদের মুক্তির জন্য জনপ্রতি এক লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করেছে তারা। ঈদের আগে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে না আনলে জেলেদের মেরে ফেলা হবে বলে জানিয়েছে জলদস্যুরা।
অপহৃতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, সারা মৌসুমে ইলিশ নেই। একাধিকবার লস দিয়েও এবার অনেক আশায় ট্রলার নিয়ে সাগরে গিয়েছিলেন তার স্বামী। কিন্তু ওঁৎ পেতে থাকা জলদস্যুরা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। জেলেদের আশপাশেই জলদস্যুদের গুপ্তচর আছে। যে কারণে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। সামনে ঈদ, এ মুহূর্তে এমন ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অপহৃতদের পরিবারের সদস্যরা।
ইউনুস মাঝির স্ত্রী খাদিজা বেগম বলেন, “মোগো কপাল তো এহন পোড়ছে। ঈদ দিয়া কী হরমু। এহন হ্যারে ফিরাইয়া আনতে পারলে আর সাগরে যাইতে দিমু না। লাগলে রিকশা কিইন্না চালাইতে কমু। আর সাগরে পাডামু না। এহন জলদস্যুগোর মুক্তিপণ দিয়া ট্রলার আর স্বামীরে ছাড়াইয়া আনোনের ক্ষেমতা নাই। মোগো দিগে কেউ চায় না। সরকারের মোগো দিকে নজর দেওন উচিৎ। নাইলে মোগো মরণ ছাড়া গতি নাই।”
একই অবস্থা অপহৃত ট্রলার মাঝি ওহিদুল, হারুন মল্লিক, মতিয়ার রহমান, জাকির, রহিমসহ অপর জেলে পরিবারগুলোর। এসব জেলে এখন জলদস্যুদের হাতে বন্দী রয়েছে।
কোস্টগার্ডে পক্ষ থেকে অভিযানের কথা বলা হলেও জিম্মি জেলেদের অবস্থানের ব্যাপারে সু-নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের অভিযান পরিচালনা ব্যহত হচ্ছে। ফলে মুক্তিপণ ছাড়া অপহৃত জেলেদের উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
জানা গেছে, দিন যত যাচ্ছে ততই জিম্মি জেলেদের ওপর নির্যাতন ততই বাড়ছে। ঈদে সুমাইয়াদের নতুন জামা কাপড়ের জন্য নয়। মুক্তিপণের টাকা জোগাড়ের জন্য এখন দিগ্বিদিক ছুটছেন ইউনুস মাঝির স্ত্রী খাদিজা। জীবনের শেষ সম্বলের বিনিময়ে হলেও ঈদের আগেই স্বামীকে ফিরে পাওয়ার বাসনা তার।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন