মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য চলতি বছর থেকে আর ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক জানিয়েছেন, এখন থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাওয়া জিপিএর ভিত্তিতেই এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। আবেদনের জন্য দুই পরীক্ষা মিলিয়ে অন্তত ৮ জিপিএ থাকতে হবে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তটি এমন এক সময় নেওয়া হলো যখন পাবলিক পরীক্ষায় শীর্ষ জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। খবর বিডিনিউজের।
সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানান, ভর্তি সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি শিগগিরই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। এদিকে চিকিৎসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ‘বৈজ্ঞানিক’ বিশ্লেষণের পর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা বাদ দিয়ে জিপিএ-এর ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত মনে করছেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক রশিদ-ই মাহবুব বলেন, এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাবলিক পরীক্ষাগুলো যথেষ্ট মানসম্পন্ন হয় কি না, তা যাচাই করা উচিৎ এবং তা (যাচাই)হওয়া উচিৎ প্রমাণসাপেক্ষে। যারা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের জিপিএ-এর ছোট ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম এ সিদ্ধান্তের কারণে তারা বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মাহবুব বলেন, “যোগ্য প্রার্থীরা যদি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি না হতে পারে তাহলে তা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে। আমি চাই এ বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হোক, যাতে মেধাবী ছাত্ররা বঞ্চিত না হয়।” তিনি বলেন, এত ব্যাপক সংখ্যক প্রার্থীর ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ‘ঝামেলা ও ঝুঁকি’ এড়াতেই সম্ভবত সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা শিক্ষা বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক শাহ আব্দুল লতিফ বলেন, তারা এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন প্রতিবছর মাত্র কিছু ছাত্র কম জিপিএ নিয়ে ভর্তি হয়।
শিগগিরই যোগ্যতার মাপকাঠি বিষয়ে বিস্তারিত চূড়ান্ত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সীমিত আসনসংখ্যার জন্য ছাত্র মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ১২টি মাপকাঠি ঠিক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষা একটি গোষ্ঠীর জন্য বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এখন তারা উচ্ছেদ হয়ে যাবে। এই পরিচালক বলেন, জিপিএ ৮ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনলাইনে আবেদন পত্র জমা নেওয়া হবে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের জিপিএ রূপান্তর করা হলে তাদের ক্ষেত্রে এটা জিপিএ ৭ হবে। তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতিতে ২০ শতাংশ কোটা থাকায় গ্রামের ছাত্ররা বঞ্চিত হবে না। সরকার গত বছর থেকে বাংলাদেশের সব ধরনের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে যৌথভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া শুরু করে। সারাদেশের ২০টি কেন্দ্রে ৪০ হাজারের বেশি ছাত্র গত বছর পরীক্ষায় অংশ নেয়। তখন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার যে কোনো একটিতে জিপিএ ৩.৫ সহ মোট জিপিএ ৮।
আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মোহাম্মদ শেফায়েত উল্লাহ বলেছিলেন, বুয়েটসহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মত মেডিকেলেও ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা প্রার্থীর সংখ্যা সীমাবদ্ধ করে দিতে পারেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগে দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে কোনো ভর্তি পরীক্ষা ছিল না। ৮০’র দশকে প্রথম ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। বাংলাদেশের সবগুলো মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ মিলিয়ে মোট ৮ হাজার ৪৯৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা ২ হাজার ৮১১টি। আর ৫৩টি বেসরকারি মেডিকেলে ৪ হাজার ২৪৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ৯টি ‘পাবলিক’ ডেন্টাল কলেজ ও মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটে ৫৬৭টি আসন রয়েছে।
নতুন পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন : দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে জিপিএ’র ভিত্তিতে নতুন পদ্ধতিতে ভর্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মেডিকেল কলেজে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা এ দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা বাতিল করে পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি। ওই সিলেবাসে মেডিকেলে ভর্তির জন্য গত এক বছর ধরে আমরা প্রস্তুতিও নিয়েছি। কেবল জিপিএ’র ভিত্তিতে ভর্তি করানো হলে আমরা ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হব। তাই অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করে পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির দাবি জানাচ্ছি।
অপর শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান সরকার বলেন, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে এক বছর আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া উচিৎ ছিল সরকারের। এখন হঠাৎ ঘোষণায় আমরা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছি। আমরা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না পেলে এর দায় কে নেবে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়(২০০৯-১০) শিক্ষাবর্ষ) উত্তীর্ণ হওয়া।
মানববন্ধনে চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজ, নৌবাহিনী কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন