প্রতি বছর এ সময় আমরা মোটামুটি ভালোই থাকি। কারণ এ সময় সাগরের ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। কিন্তু এবার তার বিপরিত। ইলিশ মৌসুম অনেকটা চলে গেলেও এখনো আমাদের জালে ইলিশ আসছে না।
কথাগুলো বলছিলেন মিরসরাইয়ের উপকূলীয় সাহেরখালী ইউনিয়নের জেলে সুকুমার জলদাশ। শুধু সুকুমার নয় এ ধরনের কথা বললেন সাহেরখালী বেড়িবাঁধে উপস্থিত হারাধন জলদাশ, বিকাশ জলদাশ, শুকলাল জলদাশসহ অনেকে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাস জেলেদের জন্য বহু প্রতিক্ষিত ইলিশের মৌসুম। মূলত বর্ষার এই তিন মাসের দিকে তাকিয়ে জেলেরা সারা বছর দিন গোনে। কারণ, এ সময় সমুদ্রে প্রচুর ইলিশের দেখা মেলে। আর এই সময়ের ইলিশ বিক্রির অর্থ দিয়েই চলে জেলেদের সারা বছরের সংসার।
এটাই উপকূলীয় এলাকার জেলে সম্প্রদায়ের আবহমান কালের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে সাগরে ইলিশ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে ইলিশের ভরা মৌসুমেও সাগর থেকে খালি হাতে ফিরছে জেলেরা।
স্থানীয় জেলেরা জানান, ভরা মৌসুমেও মিরসরাইয়ে রূপালী ইলিশের বড় আকাল চলছে। জেলেরা জীনব বাজি রেখে ইলিশের প্রধান উৎস্য বঙ্গোপসাগরের গভীরে গিয়ে পর্যাপ্ত ইলিশ পাচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি হাতে তাদের ফিরতে হচ্ছে।
কখনো কখনো অল্প কয়েকটি ইলিশ ধরা পড়লেও এক সঙ্গে সাগরে যাওয়া একদল জেলে ভাগে পড়ছে সামান্য। আর দিনের পর দিন এ অবস্থা চলতে থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে।
সরেজমিনে উপজেলার বড়দারোগারহাট, বড়তাকিয়া, হাদি ফকির হাট, মিরসরাই সদর, মিঠাছড়া বাজারে গিয়ে ইলিশের যে আকাল চলাছে তার প্রমাণ মেলে। বড়দারোগাহাট ও মিঠাছড়া বাজারে ইলিশ দেখা গেলেও তা আকারে ছোট এবং মাঝারী। বড় আকারের কোনো ইলিশ’ই চোখে পড়েনি।
বড়দারোগারহাটের মাছ প্রবীণ বিক্রেতা দুলাল জলদাশ জানান, ইলিশের কথা উঠলে বড় দুঃখ লাগে! এই মৌসুমে আমরা শুধু ইলিশ বিক্রি করেই চলতাম! ১০/১২বছর আগেও এই সময় সাগর পাড়ে ছিলো ইলিশের ছড়াছড়ি! দাম খুব কম হওয়ায় জেলেরা অনেক সময় বাজারেও আনতে চাইতো না মাছ।
আমরা সাগর উপকূলে গিয়ে একমন ইলিশ দুইশ’ তিনশ’ টাকায়ও কিনেছি। তার পর বাজারে এক কেজি ১০টাকা! কখনো কখনো আরো কম কিংবা পঁচে গেলে চার/পাঁচটি পঁচা ইলিশ ১০/১৫ টাকায় বিক্রি করতাম! কিন্তু এখন ইলিশ দূর্লভ হওয়ায় জাটকা ইলিশ আড়াই থেকে তিনশ’ টাকা এবং মাঝারি সাইজের ইলিশ চার/পাঁচশ’ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া বড় ইলিশ তো কেজি সাত/আটশ’ থেকে এক হাজারের উপরে বিক্রি হয়।’
হাদি ফকিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন জানান, এখানে ইলিশ না থাকায় তিনি চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাট থেকে ইলিশ এনেছি বিক্রির জন্য। এক সময় যে ইলিশ এখান থেকে অন্যত্র যেত এখন সেই ইলিশ অন্য জায়গা থেকে আনতে হয়!’
মিরসরাই সদর বাজারে গত কয়েকদিন ধরে ইলিশের সন্ধানে ঘুরতে থাকা এক ক্রেতা নাজিম উদ্দিন জানান, বারবার বাজারে গিয়েও তিনি ইলিশ পাননি।’
এ ব্যাপারে মিরসরাই উপকূলীয় জেলে সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিলাল জলদাশ জানান, ভরা মৌসুম হলেও বঙ্গোপসাগরের মিরসরাই-সন্দ্বীপ চ্যানেলে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরেও তারা আশা ছাড়েননি। আগামী পূর্ণিমার জোঁ-তে হয়তো এই আকালের অবসান হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য অফিসার আবুল কালাম আজাদ জানান, ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও এখন আগের মত সাগরে ইলিশ ধরা পড়ছে না। পাশাপাশি আবাহাওয়া খারাপ হওয়ায় জেলেরা গভীর সমুদ্রেও যেতে পারছে না। এ কারণে বর্তমান হাটবাজার ইলিশ শূন্য হলেও খুব শিগগিরই প্রচুর ইলিশ ধরা পড়তে পারে বলে জেলেদের মতো তিনিও আশা প্রকাশ করেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন