প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাব নিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয়ে ১৮টি স্থানে দুর্নীতি হয় বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রোববার এক গোলটেবিল বৈঠকে অনুসন্ধান প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে ২৩টি সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
বৈঠকে সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও টিআইবির সদস্য হাফিজউদ্দিন খান এই দুর্নীতি রোধে সরকারের মনোযোগহীনতাকেই দায়ী করেন। অন্যদিকে টিআইবির প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সিজিএ কার্যালয়ে যেসব ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়, তার তালিকা প্রকাশ করে টিআইবি বলছে, এই কার্যালয়ে কাজ করানোর জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্তও ঘুষ দিতে হয়।
অনিয়ম ও দুর্নীতির যে ক্ষেত্রগুলো টিআইবি চিহ্নিত করেছে, সেগুলো হল- নতুন বেতন স্কেল সংযোজন, প্রথম বেতন, বোনাস, ঠিকাদারের বিল, গাড়ির তেল/গ্যাস ও রক্ষণাবেক্ষণ বিল, ইন্টারনেট ও টেলিফোন বিল, কুরিয়ার বিল, শ্রমিক মজুরির বিল, টিএ, ডিএ বিল, কন্টিনজেন্সি বিল, পেনশন, টাইম স্কেল সংযোজন।
কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণ, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট, এলপিসি, জিপিএফ একাউন্ট স্লিপ, জিপিএফের টাকা তোলা, পরামর্শকের বিল, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, পোশাক ভাতা, কম্পিউটার বিল এন্ট্রি, চেক ডেলিভারি ও ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি পেয়েছে টিআইবি।
এছাড়া নিয়োগ, পদায়ন ও বদলিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে বলেও দুর্নীতিবিরোধী জার্মানভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ শাখার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সিজিএ কার্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে বলে টিআইবি মনে করছে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবলের অভাব, হিসাবের প্রতিবেদন সময়মত সম্পন্ন না করা, হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, নিয়োগ, পদোন্নতি ও অর্গানোগ্রামে সমস্যা, অডিট ও হিসাবের পৃথকীকরণ এবং সিএজি, সিজিএ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সমস্যা।
মন্ত্রণালয় ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গ্রেডিংয়ে সমস্যা, জবাবদিহিতা ও তদারকিতে সমস্যা, অফিস স্থাপনা ও অন্যান্য লজিস্টিকের সাপোর্টের অভাব এবং প্রশিক্ষণের সমস্যাও চিহ্নিত করেছে টিআইবি।
এইসব সমস্যা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এর ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ছে, আর্থিক বিবরণে সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না, পরবর্তী বাজেটে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”
সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ২৩টি সুপারিশে সিজিএ অফিসকে দ্বৈত ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করা এবং সংবিধান সংশোধন করে সিজিএকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিতে বলেছে টিআইবি।
“এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আদেশ পাঠাতে হবে, যাতে জুন মাসে সারা বছরের এক চতুর্থাংশের বেশি বিল না পাঠায়,” বলা হয় প্রতিবেদনে।
সিরডাপ মিলনায়তনে ‘হিসাব মহা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়।
টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে বৈঠক সঞ্চালনায় ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর অর্থমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, “টিআইবি জনমনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করে বলে তা অনেক সময়ই সঠিক হয় না।
“তবে সার্বিকভাবে বিষয়টা (অনিয়ম) আছে বলেই জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে,” স্বীকার করেন তিনি।
পেনশন ছাড়ে দেরি হওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে মুহিত সিজিএ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, “আমার দুঃখ যে পেনশন পেতে দেরি হয়। কোনো একটি কাগজের জন্য পেনশন আটকে দেওয়া হয়। আপনারা (সিজিএ অফিস) আইন কানুন মানেন না, আইন-কানুন তৈরি করেন।”
এখন থেকে জুন মাসে ২৫ শতাংশের বেশি বিল দেওয়া যাবে না বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক গত সাত মাস ধরে সিজিএ পদ খালি থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।
“রাষ্ট্রের সব হিসাব যে অফিস রাখে, সেই সিজিএ পদ ৭ মাস ধরে খালি আছে। এই পদে লোক বসানোর জন্য কারো মাথাব্যথা আছে বলে আমার জানা নেই,” বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন