সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা তদন্তে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ- ডিবি) দুই মাসের ব্যর্থতার পর তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), কিন্তু দুই মাস সাত দিন ধরে তদন্ত চালিয়েও কোনো অগ্রগতির খবর জানাতে পারেনি এই অভিজাত বাহিনী। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন তদন্ত কর্মকর্তা র্যাবের সহকারি পুলিশ সুপার জাফর উল্লাহ। তদন্তের এ পরিস্থিতিতে ‘টালবাহানা’ ও ‘সময়ক্ষেপণ’ করা হচ্ছে উল্লেখ করে বার্তা২৪ ডটনেটের কাছে সোমবার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা।
সোমবার রাতে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এর দুই অংশের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রুহুল আমিন গাজী এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বার্তা২৪ডটনেটকে বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশের পরও কোন শক্তির জোরে তদন্তকাজে গড়িমসি করা হচ্ছে সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই তাদের।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বললেন, “সাগর-রুনি হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য আমরা আন্দোলন করছি। কিন্তু খুনিরা গ্রেফতার হচ্ছে না। তদন্তকাজে কালক্ষেপন এবং যে টালবাহান হচ্ছে তাতে আমরা ক্ষুব্ধ।”
রুহুল আমীন গাজী বললেন, “তদন্তকাজে আমরা খুবই অসন্তুষ্ট। প্রশাসন এটিতে গা-ই লাগাচ্ছে না। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে তা আমরা বুঝতে পারছি না। গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে ওরা ব্যর্থ। এখন দায়িত্ব পাওয়ার পর র্যাবও এটা করে, সেটা করে। কিন্তু হত্যাকারীদের গ্রেফতার করছে না তারা।”
তবে ইতিবাচক কিছুর আশা প্রকাশ করে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বললেন, “সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যেমন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি খুনিদের গ্রেফতারের কথা বলছেন। তাদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ থাকতে পারে না। আমরা আন্দোলন করছি। আশা করি সব সন্দেহ ও গুজবের অবসান করে অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে”।
শেষ পর্যন্ত কি অপরাধীরা গ্রেফতার হবে বলে মনে করেন? এমন প্রশ্নে রুহুল আমিন গাজী বললেন, “আমরা এ পর্যন্ত কোনোভাবেই তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। তবে অপরাধীদের ধরা পড়তেই হবে। এর বিকল্প নেই। যতোক্ষণ পর্যন্ত তারা ধরা পড়বে না, ততক্ষণ আন্দোলন চলবে।”
কামাল উদ্দিন সবুজ মনে করেন, “তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া সংস্থাগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে আরো আগেই অপরাধীরা বের হয়ে আসতো।’’ তবে হতাশা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘‘এখন পর্যন্ত অপরাধীদের গ্রেফতার করার মতো কোনো কার্যক্রম আমরা দেখছি না।” একইসঙ্গে তার আশা, “সাময়িকভাবে অপরাধীরা এখন পার পেয়ে গেলেও যেকোনো সময় অবশ্যই তাদের চেহারা প্রকাশ হবে।”
তদন্ত শেষ হলেই জানাবে র্যাব
মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা র্যাব কর্মকর্তা সহকারি পুলিশ সুপার জাফর উল্লাহ এ বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। সোমবারও যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমে দেয়া মুঠোফোন নাম্বারও বন্ধ রাখছেন তিনি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখায় যোগাযোগ করলে জানানো হয়, এ বিষয়ে শাখা পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল ছাড়া অন্য কেউ কথা বলবেন না। এম সোহায়েল জানালেন, ‘আইনের বিধান মানতেই’ তারা ‘তদন্ত শেষ হবার আগে’ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে রাজধানীর রাজাবাজারে নিজেদের ফ্ল্যাটের বেডরুমে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। সেদিন সকালে অপরাধস্থলে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন জানিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া ৪৮ ঘন্টা সময় পার হওয়ার পর পরই ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার জানিয়েছিলেন, ‘‘তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’’ কিন্তু পুলিশ মহাপরিদর্শক ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’র কথা বললেও গোয়েন্দা পুলিশ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন ব্যর্থতার কথা।
এক আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে পনের দিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করে জানতে চান, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খুনিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা এবং হত্যার কারণ নির্ণয়ে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না?
১৮ এপ্রিল রুলের নিষ্পত্তির শুনানিতে হাজির হয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা রবিউল আলম জানান, তারা তদন্দে কোনো ধরণের অগ্রগতি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেদিন তদন্তের দায়িত্ব র্যাবকে দিতে নির্দেশ দেন আদালত।
র্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা সহকারি পুলিশ সুপার জাফর উল্লাহ’র নেতৃত্বে তদন্ত দল কবর থেকে নিহতদের লাশ তুলে রাসয়নিক পরীক্ষা করিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ‘ক্লু’ না পাওয়ার কথা জানায়। পরে তদন্ত দল সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙ্গা টেলিভিশন ও রুনির কর্মস্থল এটিএন বাংলা কার্যালয় গিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা ও আলামত সংগ্রহ করে।
কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি কতটুকু? এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল বার্তা২৪ ডটনেটকে সোমবার সন্ধ্যায় বললেন, ‘‘দ্বায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত কাজ চালানো হচ্ছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে।’’
সোহায়েল বললেন, ‘‘আইনের বিধান মানতেই তদন্তের স্বার্থে কাজ শেষ হওয়ার আগে সংবাদমাধ্যমে কোনো কিছু জানানো ঠিক হবে না।’’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন