গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোনয়নের অধিকার ব্যাংকের সদস্যদেরই এবং তাতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম সদস্য রোজিনা বেগম।
সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি এই আহ্বান জানান।
‘৮৫ লক্ষ দরিদ্র মহিলাকে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে’ এই সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানও গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূসের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।
গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা ৩ ভাগ জানিয়ে রোজিনা বেগম বলেন, “আমাদের মালিকানা শতকরা ৯৭ ভাগ। সুতরাং আমাদের বিষয়ে আমরাই সিদ্ধান্ত নেব।”
“যেহেতু ৩ শতাংশ মালিকানা সরকারের তারাও সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে। কিন্তু আমরা কাকে এমডি বানাব, তা আমাদের সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।”
প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনূসকে অব্যাহতি দেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ ওই পদে নিয়োগের বিধি পরিবর্তন করে ‘সংশোধিত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ জারির একটি প্রস্তাব গত ২ অগাস্ট মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে।
গ্রামীণ ব্যাংকের পদ ছাড়তে কার্যত বাধ্য হওয়া ইউনূস মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে সরকার এই ব্যাংকের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে। তা প্রতিরোধে দেশবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন নোবেলজয়ী এই বাংলাদেশি।
গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপে উষ্মা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রও। তারা বলছে, এর ফলে দরিদ্র নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও রোজিনা বেগম আলোচনা সভায় এর উপকারি দিক তুলে ধরে এর নজির হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন।
“আমার স্বামী এক সময় রিকশা চালাত, সেই হিসেবে আমার ছেলেরও রিকশা চালানোর কথা। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের কারণে আজ আমার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারছে,” বলেন তিনি।
আলোচনা সভায় আকবর আলি ছাড়াও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, সাবেক সচিব এম মুনির-উজ জামান প্রমুখ।
তারা গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত অধ্যাদেশে সই না করতে রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানান। গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্যদের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তারা।
ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার অপপ্রচার চালাচ্ছে অভিযোগ করে তা বন্ধ করতেও সভায় বক্তারা সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
আকবর আলি খান বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও এর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে সরকরের আনা অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা নেই।
“আমরা প্রকৃত সত্য জানতে চাই। প্রয়োজন হলে সমস্যা সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করতেও আমরা প্রস্তুত রয়েছি,” বলেন তিনি।
মন্ত্রিসভা ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিধি পরিবর্তনের পাশাপাশি শুরু থেকে ওই পদে মুহাম্মদ ইউনূসের নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্তও নেয়।
অন্যদিকে রাজস্ব বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওয়েজ আর্নার হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস যত অর্থ এনেছিলেন, তার কর যথাযথভাবে পরিশোধ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
আকবর আলি বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলে কিংবা শেয়ার বাজারে লক্ষ কোটি টাকা লুট হলেও কোনো মামলা কিংবা অভিযোগ দায়ের হয় না। অথচ সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে উদ্যত হচ্ছে।”
গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে সমালোচনার জবাবে সাবেক অর্থসচিব আকবর আলি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুদের হার কম হলেও তা ‘কাগজে-কলমে’, প্রকৃত পক্ষে তা গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়েও বেশি।
“মোট কিস্তির টাকা হিসেব করে গ্রামীণ ব্যাংক বা ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার যদি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয়, তাহলে এই হার অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়েও অনেক কম। কৃষি ব্যাংকের সুদের হার তাহলে কত?” প্রশ্ন করেন তিনি।
আকবর আলি বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ পেতে হলে গরিব মানুষকে ঘুষ দিতে হয়, ঋণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত শহরে এসে তদবির করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। সরকারি ব্যাংকে কাগজে কলমে ১০ শতাংশ সুদ ধরা হয়, কিন্তু এ সব অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ যোগ করলে পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।”

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন