আওয়ামী লীগের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে—এমন দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি নির্বাচন হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। একটিও জীবন ক্ষয় হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখলকারী কোনো জেনারেলের পকেট থেকে গড়ে ওঠা দল নয় যে, এর অধীনে নির্বাচন হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল, মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল। এই দলের আদর্শ হচ্ছে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সুশীল সমাজের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যাদের গণতান্ত্রিক সরকারে ভীতি কাজ করে। জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার যোগ্যতা নেই। দল করতে গেলেও ফেল করেন কিন্তু ক্ষমতার খায়েশ পুরোপুরি আছে। তারা সহজ পথে ক্ষমতার মসনদে যেতে অলিগলি পথ খোঁজেন। এসব খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৭তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অধ্যাপক ড. দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, একেএম রহমতউল্লাহ এমপি, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও নগর আওয়ামী লীগের মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম। সভা পরিচালনা করেন নূহ-উল-আলম লেনিন ও অসীম কুমার উকিল। আলোচনা সভার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
বর্তমান সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি নির্বাচন হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। একটিও জীবন ক্ষয় হয়নি। এটা তো কোনো জেনারেলের পকেট থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল নয় যে, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। আওয়ামী লীগ হচ্ছে মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল। এই দলের আদর্শ হচ্ছে, জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সুশীল সমাজের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা রাজনৈতিক দল করতে গেলে পারেন না। জনগণের কাছে ভোট চাইতে পারেন না। চাওয়ার যোগ্যতা নেই। দল করতে গেলেও ফেল করেন কিন্তু ক্ষমতার খায়েশ পুরোপুরি আছে। টকশোতে গিয়ে টেলিভিশন ফাটিয়ে ফেলেন। কলমের কালি খালি করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে খবরের কাগজে যত পারেন লিখে যাচ্ছেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। কিন্তু জনগণের কাছে গিয়ে ভোটের পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। যারা গণতন্ত্রে ভয় পান, গণতান্ত্রিক সরকার এলেই তাদের একটা ভীতি কাজ করে। তারা চেষ্টা করেন গণতান্ত্রিক সরকার এলে তাদের কীভাবে হেয় করবে। ভালো কাজকে তাদের ভালো বলতেও লজ্জা লাগে। অগণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক পন্থায় কেউ ক্ষমতায় এলে তাদের কদর বাড়ে। যে কারণে তারা এমন একটা অলিগলি পথ খোঁজেন সহজপথে কীভাবে ক্ষমতার মসনদে যাওয়া যায়। যারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে নিজেদের ভাগ্য গড়তে চান, ওইসব খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন করে আমরা জনগণের অধিকার ফিরিয়ে এনেছি। প্রজাতন্ত্রের মালিক যে জনগণ, তা প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা এদেশের মানুষের জীবন নিয়ে আর কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেবো না। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তন হবে। যারা সংসদে আছেন, এ ব্যাপারে যতটুকু সহযোগিতা চান আমরা করতে রাজি আছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ৩৭ বছর পর ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি। অর্থনৈতিক মুক্তির অগ্রগতির পথে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছি। দুর্ভাগ্য, এদেশের মানুষ যখনই একটু সুখের মুখ দেখে, তখনই একটা আঘাত আসে। স্বাধীনতাবিরোধী যে শক্তিতে ১৯৭১ সালে আমরা পরাজিত করেছিলাম, সেই পরাজিতদের দোসররা সবসময় সক্রিয়। তারা কখনোই চায় না বাংলাদেশের জনগণ সুন্দর ও উন্নত জীবন পাক। এদেশের জনগণ স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তারা বারবার ষড়যন্ত্র করেছে এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে, ভোট ও ভাতের অধিকার নিয়ে। এর ধারাবাহিকতায় ষড়যন্ত্রকারীরা ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দিল না। ওই নির্বাচনের পর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিল, তা ’৭১-এর ঘটনাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেয়। বোমা-সন্ত্রাস, খুন প্রতিনিয়ত বিষয় ছিল তখন। প্রতিদিন বোমা ফাটে আর জঙ্গিবাদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। আমরা চাই না বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যে সে ধরনের দুর্দিন আবার ফিরে আসুক। চাই না ওই ধরনের অমানিশার অন্ধকার আবার নেমে আসুক।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে যে সরকার এসেছিল, তাদের কাজ ছিল নির্বাচন দেয়া। কিন্তু তারা ক্ষমতায় এসে নিজেদের স্থায়ী করার চেষ্টা করল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি বলে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। যে কারণে ২০০৮ সালে নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগ ও মহাজোটকে ভোট দিয়েছে। আমরা সরকার গঠন করেছি। ক্ষমতায় এসে আমরা খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুত্ উত্পাদন ৩ হাজার ২শ’ মেগাওয়াট থেকে ৬ হাজার ২শ’ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের দুর্নাম ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে শান্তি ও সম্ভাবনাময় দেশে পরিণত করেছি। দেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি—এমন অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন, আজ ঢাকা শহরে পানি-বিদ্যুত্-গ্যাসের সমস্যা। ২০০১ সালের আগে শুনতাম বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। আজ কোথায় সেই গ্যাস? গ্যাসের মালিক জনগণ, সেই গ্যাস বিক্রি করবে আমেরিকান কোম্পানি, কিনবে ভারত। আমি তাতে রাজি হইনি। রাজি হয়েছিলেন বিএনপির নেত্রী। আর সেটাই ছিল আমার অপরাধ।
অনেকটা আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, আজ রোজামুখে একটা কথা বলি, আমি জাতির পিতার কন্যা। এই জাতির জন্য আমার বাবা-মা ও ভাইয়েরা জীবন দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষের এতটুকু ক্ষতি হোক অন্তত আমার দ্বারা, তা কখনও হবে না। এতে যদি আমার জীবন যায় তাতেও আমি রাজি আছি। আমি পিতা-মাতা-ভাই হারিয়ে শোকে কাতর হইনি, পাথর হয়েছি। তাই আমার মৃত্যুভয় নেই। জীবনের ভয় নেই। যে জাতির জন্য আমার পিতা জীবন দিতে পারেন, সেই জাতির জন্য কথা বলব—তার জন্য সাহসের প্রয়োজন কোথায়? শোক বুকে নিয়ে তো আমি মৃত্যুপুরীতে এসেছিলাম। এখানে খুনি ও খুনিদের মদতদানকারীরা আছে জেনেই তো আমি এসেছিলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা-বিশ্বাসই আমার শক্তি। সেই আস্থা-বিশ্বাস আছে বলেই আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসি দিতে পেরেছি।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়েছে অভিযোগ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, খুনি রশীদদের দিয়ে জেনারেল জিয়া দল করিয়েছিলেন। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, মানিক মিয়ার ছেলে, ইত্তেফাকে ছিলেন, তিনিও খুনি। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিকে নিয়ে ‘প্রগশ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল করেছিলেন। এরপর জেনারেল এরশাদ ফারুককে দিয়ে রাজনৈতিক দল করালেন এবং তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করালেন। জিয়ার স্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ভুয়া নির্বাচন করেছিলেন। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনি হুদাকে বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েছিলেন বিএনপির নেত্রী। তারা জাতির পিতার খুনিদের এভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, জাতির পিতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে গিয়েছিলেন; কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই বিচার বন্ধ করেছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছিলেন, মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। আমরা সেই বিচার আবার শুরু করেছি। ইনশাল্লাহ সেই বিচার শেষ আমরা করব। আমরা বিডিআর বিদ্রোহের বিচার শুরু করছি। বিচার চলছে। কোনো ভুয়া বিচার নয়, প্রকৃত বিচার হচ্ছে। বড় বড় সেনা ও নৌবাহিনীর অফিসার, আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা এ বিচারের সাক্ষ্য দিচ্ছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, খুনিদের কারা বাঁচাতে চায়। আসামিদের পক্ষে কারা দাঁড়ায়, তা দেখলে সবকিছু আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে—সবসময় অপরাধীদের মদত দেয়া এদের চরিত্র।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতির পিতা রক্ত দিয়ে আমাদের ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলে সেই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। এটাই হোক শোক দিবসের শপথ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন